blog

ডেঙ্গু জ্বর হওয়ার কারন, লক্ষণ ও প্রতিকারের উপায়

ডেঙ্গু জ্বর, যা ব্রেকবোন জ্বর নামে পরিচিত, হল একটি মশা বাহিত সংক্রমণ। যা মারাত্মক অসুস্থতার কারণ হতে পারে। এটি চারটি ভিন্ন ভাইরাসজনিত কারণে এবং এডিস মশার দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে। তাই ডেঙ্গু হওয়ার থেকে সচেতন হন ও সাবধানে থাকুন। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

দ্রুত জেনে নিন ডেঙ্গু বিষয়ে কিছু তথ্যঃ

এডিস ইজিপ্টিএবং এডিস অ্যালবপিকটাস মশা দ্বারা ডেঙ্গু সংক্রমণ হয়। যা সারা বিশ্বে পাওয়া যায়।

প্রায় আড়াই বিলিয়ন বা ২৫০ কোটি মানুষ অর্থাৎ বিশ্বের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ মানুষ,এমন অঞ্চলে বাস করেন যেখানে ডেঙ্গু সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগর, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের কমপক্ষে ১০০টি দেশে ডেঙ্গু দ্বারা মানুষ প্রতিবছর আক্রান্ত হন।

সাধারণত মশার কামড়ের ৩ থেকে ৭ দিন পরে লক্ষণগুলি দেখা দেয় এবং সাধারণত ৩ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত এটি স্থায়ী হয়।

দ্রুত ব্লাড টেস্ট করে চিকিৎসা শুরু করলে তবেই এর থেকে জলদি প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।

ডেঙ্গু হওয়ার কারন কি?

চারটি ডেঙ্গু ভাইরাস (DENV) রয়েছে যা ডেঙ্গু জ্বরের কারন। এগুলি এডিস ইজিপ্টি নামে পরিচিত এক প্রজাতির মশার দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে। এডিস অ্যালবপিকটাস মশা দ্বারা খুব কমই ছড়ায়।

সিডিসির (CDC) মতে, ভাইরাসগুলি ১০০ থেকে ৮০০ বছর আগে বানরের থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছিল, তবে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ডেঙ্গু এখন একটি সামান্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারন উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য।

এডিস ইজিপ্টিটির উৎপত্তি আফ্রিকাতে হয়েছিল তবে আজকাল এটি পৃথিবীজুড়ে গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে পাওয়া যায়। বিশেষত অধিক জনসংখ্যা বহুল অঞ্চলের আশেপাশে এটি বেশি মাত্রায় দেখা যায়।

এই ভাইরাস সংক্রামিত মশা থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। একটি মশা ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ায় তারপর সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে ভাইরাসটি চলে যায় তার শরীরেরও। এভাবেই এই ভাইরাস ছড়ায়।

একাধিকবার ডেঙ্গু জ্বর হওয়া সম্ভব। দ্বিতীয়বার কোন ব্যক্তি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে তার সেরে উঠতে অনেক সময় লাগে। অনেক্ষেত্রে ব্যক্তি মারা যেতেও পারে।

ডেঙ্গুর লক্ষণ ও উপসর্গঃ

রোগের তীব্রতার উপর নির্ভর করে ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ।

হালকা ডেঙ্গু জ্বর:

ভাইরাস বহনকারী মশার কামড়ানোর পরে ৭ দিন পর্যন্ত লক্ষণগুলি দেখা দিতে পারে।

লক্ষণ:

শরীরের নানা পেশী এবং জয়েন্টে ব্যথা হওয়া।

শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া। যা মিলিয়ে যায় আবার দেখা দেয়।

মাত্রাতিরিক্ত জ্বর ও তার সাথে তীব্র মাথাব্যথা। চোখের পিছনে ব্যথা ও বমি বমি ভাব।

লক্ষণগুলি সাধারণত এক সপ্তাহ পরে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং হালকা ডেঙ্গুতে গুরুতর বা মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয় না।

তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ট্রিটমেন্ট করা খুবই জরুরি।

ডেঙ্গু হেমোরজিক জ্বর

প্রথমদিকে, ডেঙ্গু হেমোরজিক জ্বর’এর লক্ষণগুলি হালকা ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণসহ দেখা দেয়। কিছু দিনের মধ্যে এগুলি ধীরে ধীরে আরও খারাপ হয়। হালকা ডেঙ্গুর লক্ষণগুলির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হতে শুরু করে।

লক্ষণ:

মুখ, মাড়ি বা নাক থেকে রক্তপাত হওয়া।

রক্তনালীর ক্ষতি হওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ রক্তপাত শুরু হওয়া। যা কালো বমি আকারে বা মলের সাথে বের হতে দেখা যায়।

ডেঙ্গু হলে রক্তে প্লেটলেট কমে যাওয়া অধিক মাত্রায়।

পেটের নানা সমস্যা যেমন পেট ব্যথা থেকে শুরু করে পেট খারাপ হওয়া।

ত্বকে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়া।

পালস রেট নর্মালের চেয়ে কমে যাওয়া।

দ্রুত চিকিৎসা না শুরু করলে এটি মারাত্মক আকার নিতে পারে।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম):

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম বা ডিএসএস ডেঙ্গির একটি মারাত্মক রূপ। হালকা ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ছাড়াও আরও অনেক উপসর্গ দেখা দেয় এটি হলে।

লক্ষণ:

এতে তীব্র পেটে ব্যথা হতে পারে।

হঠাৎ হাইপোটেনশন, বা রক্তচাপ দ্রুত কমে যেতে পারে।

নিয়মিত বমি বমি ভাব দেখা যায়। খাওয়ার ইচ্ছে থাকে না।

রক্তে প্লেটলেট কমে যায় ভয়ংকর ভাবে।

দ্রুত চিকিৎসা না শুরু করলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

ডেঙ্গুর চিকিৎসাঃ

ডেঙ্গু হ’ল একটি ভাইরাস, সুতরাং নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা বা নিরাময় নেই।

তবে রোগটি কতটা মারাত্মক তার উপর নির্ভর করে প্রাথমিক ভাবে ট্রিটমেন্ট শুরু করা হয়।

ডেঙ্গু হলে চিকিৎসাঃ

দ্রুত ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধ করা। কারন অধিক মাত্রায় জ্বরের জন্য এবং বারবার বমি হওয়ার ফলে শরীরে জলের মাত্রা কমে যায়।

ব্যক্তির অবশ্যই পরিষ্কার জল পান করা উচিত, ট্যাপের জলের বদলে মিনারেল ওয়াটার এক্ষেত্রে পান করা ভালো।

রিহাইড্রেশন লবণও শরীরে তরল এবং খনিজের প্রতিস্থাপনেও সহায়তা করতে পারে।

ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবে যেমন টাইলেনল বা প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে। এগুলি জ্বর কমাতে এবং ব্যথা কমাতে সহায়তা করে।

নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগস (NSAIDs) যেমন এসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনকে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় না, কারণ এতে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সবচেয়ে প্রথম কাজ। কারন চিকিৎসকের চিকিৎসা ছাড়া ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হওয়া খুবই কঠিন।

তাই কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। সময় নষ্ট করবেন না এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

দুদিনের বেশি কোন জ্বর হলেই রক্ত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সাবধানতা অবলম্বনঃ

কোনও ভ্যাকসিনই ডেঙ্গু জ্বরের বিরুদ্ধে রক্ষা করতে পারে না। কেবল মশার কামড় এড়ানো ছাড়া।

বাড়ির ভিতর ও বাইরে পরিষ্কার রাখুন। জল জমতে দেবেন না বাড়ির চারপাশে। নোংরা জলেই মশারা ডিম পাড়ে। এডিস মশা এতেই প্রজনন করে।

মশার উপদ্রব দেখা দিলে তা দূর করার পাশাপাশি মশারি টাঙ্গিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা করুন দিনরাত উভয় সময়েই।

বাচ্চাদের দিকে খেয়াল রাখুন। ডেঙ্গু দ্বারা দ্রুত বাচ্চারাআক্রান্ত হয় যা মারাত্মক রূপ নিতে পারে।

জানলায় মশার জাল বা মশকিউটো নেট লাগানোর ব্যবস্থা করুন। এতে মশা ঘরে ঢুকতে পারবে না।

মশার প্রজনন কমাতে কি কি করনীয়ঃ

জলা জমে মশা প্রজনন করে। তাই জল জমতে দেবেন না।

বালতি এবং জল রাখার পাত্রে বেশিদিন ধরে জল জমিয়ে রাখবেন না। দুদিন অন্তর তা পরিষ্কার করবেন।

গাছের টবে জমা অতিরিক্ত জল অপসরণ করুন। পরিমান মত জল দিন গাছে যাতে জলই জমতে না পারে।

মশার ডিম অপসারণ করতে টবের থেকে মাটি আলগা করুন, উপরের জঞ্জাল পরিষ্কার করুন রোজ।

বাড়ির আশেপাশে ড্রেন পৌরসভাকে দিয়ে পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থা করুন। যাতে ড্রেনে নোংরা জল না জমে। ড্রেনের চারপাশে ব্লিচিং ছড়ানোর উচিত সপ্তাহে একবার করে। এই ড্রেনই মশার আতুর ঘর।

ঘরে ফুলদানি থাকলে তার জল দুদিন অন্তর পরিষ্কার করুন অবশ্যই।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


%d bloggers like this: