blog

এন্ডোমেট্রিয়ামের পুরুত্বঃ গর্ভাবস্থার জন্য স্বাভাবিক রেঞ্জ কত?

গর্ভাবস্থা বজায় রাখার জন্য একটা শরীরে বেশ কিছু জিনিস ঠিকমত থাকা প্রয়োজন যাতে সফলভাবে গর্ভধারণটি হয়ে থাকে।আর নিষেক হল সেই হিমশৈলেরই শীর্ষ প্রান্ত– আপনার জরায়ুর মধ্যে এ হেন অসংখ্য প্রক্রিয়া হতে থাকবে যেগুলি ডিম্বাণুর সুরক্ষিত থাকাকে নিশ্চিত করে।সে ব্যাপারে অন্যতম একটা মূল বিষয় হল এন্ডোমেট্রিয়াম এবং এর প্রাচীরের পুরুত্ব।

এন্ডোমেট্রিয়াম কি?

জরায়ুর প্রাচীরের আভ্যন্তরীণ দিকে শ্লেষ্মা ঝিল্লী দ্বারা গঠিত একটা আস্তরণ থাকে।এগুলি সম্পূর্ণভাবে এন্ডোমেট্রিয়াম গঠণ করে।এটি দুটি স্তরে গঠিত হয়– একটা হল কার্যকর স্তর যেটা প্রতি মাসিকচক্রের সময় নিজে থেকেই স্খলিত হয়ে যায়, আর আপর স্তরটা হল এর মূল অংশ যা জরায়ুর প্রাচীরের উপর স্থায়ীরূপে থেকে যায়।মাসিকচক্রের উপর নির্ভর করে এন্ডোমেট্রিয়ামের ঘনত্ব বা পুরুত্বটি পরিবর্তিত হতে থাকে।

গর্ভধারণ করার জন্য বা গর্ভবতী হয়ে ওঠার জন্য এন্ডোমেট্রিয়ালের স্বাভাবিক ঘনত্ব বা পুরুত্ব কত থাকা প্রয়োজন?

এন্ডোমেট্রিয়াল স্তরটি নিজেই বেশ পাতলা।মাসিক চক্রের শেষের দিকে, যখন উপরের স্তরটি পুরোপুরি স্খলিত হয়ে যায়, তখন অবশিষ্ট থেকে থাকা স্তরটি বড় জোর 1 মিমি মত পুরু হয়।পরবর্তী ওভ্যুলেশন চক্রটি শুরু হওয়ার সাথে কোষগুলি এর উপর নতুন কার্যকর স্তর গড়ে তোলা শুরু করে।

সাধারণত স্তরটির পুরুত্ব প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, তবে গর্ভধারণের জন্য এন্ডোমেট্রিয়ামের পুরুত্বটির স্বাভাবিক রেঞ্জ প্রায় 8 মিমি মত বিবেচনা করা হয়ে থাকে যেটি মোটামুটি প্রায় 15 মিমি মত হওয়া উচিত নিষিক্ত ডিম্বাণুটিকে সুরক্ষিত ভাবে ধরে রাখার জন্য।

এন্ডোমেট্রিয়াম পাতলা হওয়ার কারণগুলি কি?

1.কম রক্ত প্রবাহ

যদি পর্যাপ্ত রক্ত প্রবাহ না হয়ে থাকে, তবে গর্ভধারণের জন্য পর্যাপ্ত পুরু এন্ডোমেট্রিয়ামটি গঠণের ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।পর্যাপ্ত রক্ত প্রবাহের অভাবের ফলে জরায়ু হেলে যেতে পারে, জরায়ুর মধ্যে ফাইব্রয়েডগুলি দেখা দিতে পারে অথবা আবার এমনকি একটা আলিস্যিভরা জীবনযাত্রা গড়ে উঠতে পারে।

2.এন্ডোমেট্রিয়ামের বৃদ্ধির ভুল গতি

একটি সাধারণ ভিত্তিতে, এটি দেখা গেছে যে, 6 মিমি–এর কম যেকোনও পুরুত্বই গর্ভধারণ সফল হতে বাধা দিতে পারে।তবে আবার 8 মিমি পুরুত্বেও যদি এন্ডোমেট্রিয়ামের স্তরটির বৃদ্ধি যে গতিতে হওয়া উচিত সেই গতিতে না থাকে, সেটি গর্ভধারণে বাধা দিতে পারে।

3.ইস্ট্রোজেন সম্পর্কিত সমস্যা

ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে গেলেও তা আবার কখনও কখনও কোষের বৃদ্ধি রোধ করতে পারে, ফলস্বরূপ যা আবার এন্ডোমেট্রিয়ামের ঘনত্বে বাধা দান করে।

4.প্রোজেস্টেরণের অনুপযুক্ত কার্যপ্রণালী

যখন প্রোজেস্টেরণ হরমোনটি প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিকমত কাজ করে না, এন্ডোমেট্রিয়াল স্তরটি পুরু হয় না।

5.প্রজনন সংক্রান্ত ওষুধগুলির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

বিদ্রূপের এক নিষ্ঠুর মোড়ে, ফার্টিলিটি বা উর্বরতা বাড়াতে এবং ওভ্যুলেশন বা ডিম্বোস্ফোটনে সাহায্য করতে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট ওষুধ অসাবধানতাবশতই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে যার ফলে এন্ডোমেট্রিয়াল স্তরটি পাতলা হয়ে যায়।

6.ভীষণ চাপদায়ক জীবনযাত্রা

পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঘুমের অভাবে মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে যা এন্ডোমেট্রিয়াল স্তরের সর্বোত্তম বৃদ্ধি ব্যহত করতে পারে।

গর্ভধারণের জন্য এন্ডোমেট্রিয়ালের ঘনত্ব বাড়ানোর উপায়গুলি

এমন কয়েকটি উপায় আছে যার মাধ্যমে আপনি আপনার এন্ডোমেট্রিয়ামের স্তরটির ঘনত্বের উন্নতি করতে পারেন এবং গর্ভধারণের জন্য এটিকে উপযুক্ত করে তুলতে পারেন।এখানে সেগুলি বলা হলঃ

1.একটা ভাল ডায়েট

সুষম এবং পুষ্টিকর আহার গ্রহণ করলে তা ইস্ট্রোজেনের মাত্রার উপর প্রভাব ফেলে, হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে আর রক্ত প্রবাহকে বাড়িয়ে তোলে।আর এই সকল বিষয়গুলি একত্রে গর্ভাবস্থার জন্য আদর্শ এন্ডোমেট্রিয়ামের ঘনত্বের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

আপনার ইনসুলিন এবং করটিসোলের একটা স্বাস্থ্যকর মাত্রা বজায় রাখতে সারাদিন ঠিকমত আহার করুন।ডায়েটে ফাইবারের সাথে সাথে Q10 কোএনজাইম আছে এমন খাদ্য আইটেমগুলিও অন্তর্ভূক্ত করুন।এই Q10 কোএনজাইম হল একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা কলা জনিত চাপ হ্রাস করে এবং একটা পুরু এন্ডোমাট্রিয়াল স্তর গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

সবুজ শাক–সবজি, টমেটো, ডিম, গাজর এবং মাছের মত খাদ্য উপকরণগুলির মধ্যে রয়েছে নানা ধরণের ভিটামিন, যেমন ভিটামিন C এবং E এর সাথে B-কমপ্লেক্সের গ্রুপটাও, যা স্বাস্থ্যকর রক্ত ​​সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয়, সুতরাং এই উপকরণগুলি আপনার ডায়েটের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করা নিশ্চিত করুন।আপনার স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য ক্যফাইন এবং টক জাতীয় খাদ্য আইটেমগুলি কমিয়ে ফেলুন।

2.পর্যাপ্ত বিশ্রাম

ভাল পরিমাণ বিশ্রাম এবং ঘুম হরমোনের একটা ভাল ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে যা এন্ডোমেট্রিয়ামের ঘনত্বকে প্রভাবিত করে।কমপক্ষে 7-8 ঘন্টা একটানা একটা নির্বিঘ্নে ঘুম দেহ মেরামত ক্রিয়াগুলি পরিচালনা করতে এবং সন্তোষজনকভাবে কলার বৃদ্ধি হওয়ার জন্য অপরিহার্য।ফলে নিয়মিত একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস বজায় রাখুন, অনেক বেলা অবধি ঘুমানো বা অনেক রাত করে শোওয়া এড়িয়ে চলুন।

3.নিয়মিত যোগ–ব্যায়াম

রক্ত সঞ্চালন বাড়ানোর একটা প্রাকৃতিক উপায় হল যোগ–ব্যায়াম করা।
জরায়ুতে রক্তের বর্ধিত সরবরাহ এন্ডোমেট্রিয়াম কোষগুলির বিকাশে সহায়তা করে এবং তার ঘনত্বও বাড়িয়ে তোলে।নিবিড় অনুশীলনের প্রয়োজন পড়ে না; এর জন্য প্রতিদিন প্রায় আধ ঘন্টা ব্যায়াম করাই যথেষ্ট। আপনার শরীরকে একধরণের ক্রিয়ায় অভ্যস্ত হতে বাধা দিতে বিভিন্ন ধরণের ব্যায়াম করুন।আর নিয়মিত অনুশীলন করলে তা ভাল ঘুম হতে সাহায্য করে যা পরিণামস্বরূপ এন্ডোমেট্রিয়াল স্তরটির বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

4.ফিমোরাল আর্টারি ম্যাসাজ করা

দেহস্থ জরায়ু এবং শ্রোণী অঞ্চলের দিকে রক্ত সরবরাহ বাড়ানোর একটা প্রমাণিত উপায় হল ফিমোরাল আর্টারিকে উদ্দীপিত করা।আপনার আঙ্গুলগুলির সাহায্যে ধীরে ধীরে কয়েক সেকেন্ড ধরে ধমনীর উপর চাপ দিন।এই ব্যায়ামটি প্রতিটি পায়ে তিন বার করে করে দিনে বেশ কয়েকবার করুন।এটি সাধারণত মাসিক চক্রের শেষ থেকে ওভ্যুলেশন বা ডিম্বোস্ফোটন না হওয়া পর্যন্ত অনুসরণ করা উচিত যাতে এটি এন্ডোমেট্রিয়ামের বৃদ্ধিতে যথাযথভাবে সহায়তা করতে পারে।IVF বা উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণকগুলির ক্ষেত্রে ধমনীতে মালিশ করা এড়িয়ে চলা উচিত।

এখানে দেওয়া হল ফিমোরাল ধমনীতে মালিশ প্রক্রিয়াটি কীভাবে করতে হবেঃ

  • আপনার উপরের থাই এবং তলপেটের মধ্যে ক্রিজটি বা ভাঁজটির সন্ধান করুন
  • ক্রিজ বরাবর গিয়ে নাড়ির স্পন্দনটি সন্ধান করুন।এবার এর উপর ধীরে ধীরে আলতো চাপ দিন ততক্ষণ, যতক্ষণ না আপনি স্পন্দনটি থেমে যাওয়া অনুভব করেন।
  • এবার এটি 30 সেকেন্ডের জন্য ধরে রাখুন, সময় হয়ে গেলেই চাপটা ছেড়ে দিন।
  • এই একই প্রক্রিয়া অপর পা–টিতেও পুনরাবৃত্তি করুন।তারপরে, ডিম্বাশয় এবং জরায়ুতে রক্ত ​​সঞ্চালনের জন্য আপনার পেটে আলতোভাবে মালিশ করুন।

আপনার মাসিক শুরু হওয়া কিম্বা গর্ভবতী হওয়ার খবরটা যদি আপনার জ্ঞাত থাকে, সেক্ষেত্রে এই ব্যায়ামটি না করার পরামর্শই আপনাকে দেওয়া হচ্ছে।

5.আকুপাংচার

আকুপাংচার দেহের মধ্যে রক্ত ​​সরবরাহ পুনর্গঠন করতে সাহায্য করে, প্রজনন ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে।এই প্রাচীন অনুশীলনটি প্রসবকে সহজতর করা এবং গর্ভবতী মহিলাদের স্বস্তি এনে দিতেও পরিচিত।গবেষণায় দেখা গেছে যে,কিডনির চারপাশে রক্ত সঞ্চালন শক্তিশালী হয়ে উঠলে তা জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াল রক্তবাহগুলির গড়ে ওঠাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে যা ফলস্বরূপ IVF পদ্ধতিটিকে সফল করে তোলে।

6.ক্যাস্টর অয়েল

রিকিনোলিক অ্যাসিড এমন একটি রাসায়নিক যা রক্তের প্রবাহ বৃদ্ধি, নিরাময় প্রক্রিয়াতে সাহায্য এবং টিস্যু বা কলাগুলির গঠনে সহায়তা করার জন্য পরিচিত।এটি বিশেষ করে ডিম্বাশয় এবং গর্ভকে প্রভাবিত করে।এই অ্যাসিডটি ক্যাস্টর অয়েলে পাওয়া যায় এবং এটি ব্যবহার করা বেশ উপকারী হতে পারে।

রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি এবং আপনার এন্ডোমেট্রিয়াল স্তরকে পুরু করে তুলতে সহায়তা করতে আপনি ব্যবহার করতে পারেন এমন এক ক্যাস্টর অয়েল প্যাক সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলঃ

  • একটা খালি বাটির মধ্যে একটা নরম সুতির কাপড় অথবা রুমাল রাখুন।
  • তার ওপর ক্যাস্টর অয়েল ঢালুন– বেশ ভালমত পরিমাণে ঢালুন যাতে পুরো রুমালটা তেলে ভরে যায়।বাটির ভিতরে রুমালটা ভালভাবে নেড়েচেড়ে নিন যাতে বাটির সবটা তেল ঐ রুমালে শুষে যায়।
  • এবার ঐ বাটিটার মধ্যেই রুমালটাকে 30 মিনিটের জন্য ফেলে রাখুন।
  • রুমালে যখন সবটা ক্যাস্টর অয়েল শুষে যাবে, চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে, রুমাল বা কাপড়টিকে আপনার উন্মুক্ত পেটের উপর রাখুন।আপনার নাভি থেকে শুরু করে আপনার শ্রোণী হাড়ের নিচ পর্যন্ত সমগ্র জায়গাটা কাপড়টি দিয়ে আবৃত করে রাখতে হবে।
  • রুমালটাকে পেটের উপর দিয়ে রাখার পর সেটার ওপর একটা প্লাস্টিক কভার ঢেকে মুড়ে দিন।এবার একটা গরম জলের বোতল নিয়ে আপনার পেটের ওপর প্লাস্টিক কভারের ওপর রাখুন।এই অবস্থায় 30-40 মিনিট শুয়ে থাকুন।
  • এই কাজটি নিয়মিতভাবে করে চলুন, তবে মাসিকচক্র চলাকালীন সেটা করা থেকে বিরত থাকুন।

1.এন্ডোমেট্রিয়াম কতটা পুরু হলে তাকে খুব বেশি বলা হয়?

একটা পাতলা স্তর বিশিষ্ট এন্ডোমেট্রিয়াল যেমন সমস্যার, সেরকমই এর স্তরটি খুব বেশি পুরু হলেও তা একটা সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।এন্ডোমেট্রিয়াল হাইপারপ্লাজিয়া হল এই অবস্থাটি সংজ্ঞায়িত করার জন্য চিকিৎসাবিদ্যার একটা পরিভাষা, যা সাধারণত ইস্ট্রোজেনের মাত্রা অতিরিক্ত হওয়ার কারণে ঘটে।আর এই অবস্থায় স্তরটি 10-15 মিমি–এর থেকেও পুরু হয়।

2.এন্ডোমেট্রিয়াল 5 মিমি পুরু হলে গর্ভবতী হয়ে ওঠা কি সম্ভব?

একটা গর্ভাবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে 5 মিমি পুরু স্তরটি বেশ পাতলা।সেক্ষেত্রে ওভ্যুলেশন প্রবৃত্ত করানো এবং প্রোজেস্টেরণ পরিপূরকগুলির প্রয়োজন হতে পারে।

গর্ভধারণের জন্য সঠিক এন্ডোমেট্রিয়াল ঘনত্ব গর্ভবতী হওয়া এবং গর্ভাবস্থা বজায় রাখার সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় একটি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান।একটা স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার মানকে বেছে নেওয়ার সাথে সংলগ্ন থেকে এবং অবস্থাটির যত্ন নিতে ঠিক মত চিকিৎসা ব্যবস্থা অবলম্বন করলে তা একটা শিশুর জন্য আপনার শরীরকে দুর্দান্ত পরিবেশে পরিণত করতে সহায়তা করে।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


%d bloggers like this: