blog

শিশুদের মাথা ব্যথার সাথে কীভাবে মোকাবিলা করবেন

বহু কারণ থেকে আপনার শিশু মাথা ব্যথায় ভুগতে পারে।মানসিক চাপ থেকে ক্ষীণ দৃষ্টীশক্তি, আবার তা থেকে ঘুমের অভাব-এরকম নানা ভাবেই তার মধ্যে মাথা ব্যথা বা মাথা ধরা আসতে পারে।এই মাথা ব্যথার কারণ এবং ধরণগুলি সম্পর্কে জেনে নিলে তা আপনার শিশুর মাথা ব্যথা মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে এবং সেটি হওয়া থেকে তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করার ক্ষেত্রে আপনাকে সহায়তা করবে।

শিশুদের মাথা ব্যথার কারণগুলি

যদিও আমরা বাচ্চাদের সাথে মাথা ব্যথার বিষয়টি সাধারণত সংযুক্ত করি না কিন্তু অবাক করে দেওয়ার মত সংখ্যক শিশুরাই এই মাথা ধরায় বা ব্যথায় ভুগে থাকে।কোনও শিশুর মাথা ব্যথা হওয়ার পিছনে অনেক কারণই থাকতে পারে।

1. অসুস্থতা

মাথা ব্যথার সর্বাধিক সাধারণ একটি অন্যতম কারণ হল অসুস্থতা যেমন সর্দি,কাশি,ঠাণ্ডা লাগা, জ্বর অথবা এমনকি সাইনাসের সংক্রমণ।এই ধরণের মাথা ধরার সমাধান নিজে থেকেই হয়ে যাবে যখন এর অন্তর্নিহিত অসুস্থতা বা সংক্রমণের চিকিৎসা করা হবে।এই দৃশ্যপটে,মাথা ধরা বা ব্যথাটি হল অসুস্থতার কারণে হয়ে থাকা ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ।

2. মাথায় আঘাত

খেলার সময় কিম্বা অন্য কোনও সময়ে মাথায় আঘাত পেয়ে ফুলে গিয়ে থাকলেও তা মাথা ব্যথার কারণ হতে পারে।যদিও সকল আঘাত জনিত ফোলাগুলিই উদ্বেগের কারণ হয় না,তবে আপনি যদি মনে করেন যে আপনার ছোট্টটি তার মাথায় বেশ কড়া ধরনের বড়সড় আঘাতই পেয়েছে সেক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল হল আপনি বিষয়টিকে ডাক্তারের মনোযোগে নিয়ে আসুন।মাথা ব্যথাটি যদি অবিরত চলতে থাকে এবং সময়ের সাথে তা আরও খারাপ হতে থাকে সেক্ষেত্রে আপনার অবশ্যই চিকিৎসাগত সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

3. মানসিক চাপ

মানসিক চাপ এবং উদ্বেগও শিশুদের মধ্যে মাথা ব্যথা হওয়ার কারণ হয়ে উঠতে পারে।বিদ্যালয়ের চাপ,বিদ্যালয়ের পরবর্তী বাইরের অন্যান্য অতিরিক্ত ক্রিয়াকলাপের চাপের সাথে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে মোকাবিলা করে চলতে হবে তা এখনও পর্যন্ত অনেক শিশুই হয়ত জানে না আর তার ফলে এটিই হয়ত তাদের মধ্যে মাথা ব্যথা রূপে প্রকট হয়ে ওঠে।অবসাদ, বিষণ্ণতার লক্ষণগুলির মধ্যে একটি হল মাথা ব্যথা।

4. কিছু বিশেষ খাদ্য এবং পানীয়

খাদ্যের কিছু অতিরিক্ত বিশেষ সংযোজনও মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে।শুকনো মাংস যেমন টার্কী,ব্যাকন(লবণ মাখানো শুকনো শূকরের মাংস)কিম্বা হ্যামের মধ্যে থাকে নাইট্রেট,আর এগুলিকে যখন অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া হয়ে থাকে,তখন তা মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে।অপর যে অ্যাডিটিভটি খাবারের মধ্যে সাধারণত দেখতে পাওয়া যায়,তা হল MSG-এটিও মাথা ব্যথার কারণ হিসেবে পরিচিত।পানীয় সোডা,কফি এবং চায়ের মত ক্যাফিনযুক্ত পানীয়গুলিও আবার মাথা ধরার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

5. বংশগত

কিছু ধরনের মাথা ব্যথা যেমন মাইগ্রেনের ব্যথা সাধারণত বংশগত হয়ে থাকে এবং যদি আপনি অথবা আপনার পরিবারের কোনও সদস্য এটিতে ভুগে থাকেন তবে সেক্ষেত্রে বংশানুক্রমিক ভাবে আপনার শিশুটির উপরেও এটি প্রভাব ফেলবে।

6. মস্তিষ্কের সমস্যা

কখনও কখনও মাথা ধরা আবার মস্তিষ্কের সাথে জড়িত কোনও অন্তর্নিহিত সমস্যার একটি লক্ষণও হয়ে থাকতে পারে।এটি টিউমার,ফোঁড়া কিম্বা রক্তপাতের নির্দেশকও হতে পারে।তবে এই শর্তগুলির সাথে আবার অন্যান্য লক্ষণগুলির পাশাপাশি ঝাপসা দৃষ্টিও অনুষঙ্গী হয়ে থাকে।

শিশুদের মাথা ব্যথার ধরণগুলি

মাথা ব্যথাকে বিস্তৃতভাবে চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যেতে পারে।সেগুলির প্রতিটি বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন কারণের জন্য হতে পারে,সুতরাং সেগুলির চিকিৎসা ব্যবস্থাগুলিও বিভিন্ন হয়ে থাকে।একটি শিশুর মধ্যে একাধিক ধরণের মাথা ব্যথা থাকতে পারে এবং সেই মাথা ব্যথার ধরণটিকে খুঁজে বের করাটা হল একটি যুদ্ধের অর্ধেক জয় করে ফেলার সমান।

1. মাইগ্রেনেরমাথাব্যথা

মানসিক চাপ,ঘুমের অভাব অথবা এমনকি কিছু বিশেষ ধরণের খাদ্য পদও মাইগ্রেনের ব্যথাকে বাড়িয়ে তোলার কারণ হয়ে থাকে।শিশুদের মধ্যে হয়ে থাকা সবচেয়ে সাধারণ ধরণের মাইগ্রেনগুলি হল প্যারোক্সিমাল ভার্টিগো এবং সাইক্লিক ভোমিটিং বা বমির পুনরাবৃত্তি।পূর্ববর্তীটি ভার্টিগোর সাথে সম্পর্কিত যেখানে হঠাৎ ঘূর্ণনের সংবেদনটি হয়ে থাকে যা আবার কয়েক মিনিটের মধ্যে কেটেও যায়।আর পরের ধরণের মাইগ্রেনটির সাথে বমি হওয়ার একটি পর্ব যুক্ত থাকে।কিছু ক্ষেত্রে আবার এই বমি হওয়ার ব্যাপারটা মাথা ব্যথার সাথে জড়িত নাও হয়ে থাকতে পারে।

লক্ষণগুলি

  • মাথার এক বা উভয় পাশেই দপদপ করে বা স্পন্দন অনুভূত হয়ে মাথা ব্যথা করা।
  • কোনও রকম পরিশ্রম করার সাথে সাথে মাথা ব্যথাটির আরও খারাপ অবস্থা হওয়া।
  • বমি বমি ভাব
  • বমি হওয়া
  • আলো এবং শব্দে সংবেদনশীলতা
  • মাথা ঘোরা
  • পেট ব্যথা করা
2. টেনশন বা চাপা উত্তেজনায় মাথা ব্যথা

এটি শিশুদের মধ্যে হয়ে থাকা সবচেয়ে সাধারণ ধরণের একটি মাথা ব্যথা।এটি সাধারণত একপ্রকার ছোট খাটো মানসিক বিপর্যয়ের অভ্যুত্থান অথবা কোনও শারীরিক চাপের কারণে হয়ে থাকে।পড়াশুনা কিম্বা অন্য যেকোনও কারণেই এই চাপ সৃষ্টি হয়ে থাকুক না কেন তার প্রকৃত কারণটিকে চিহ্নিত করতে পারলে তা আপনার শিশুকে সেই সমস্যাটিকে কাটিয়ে তার সমাধান করতে সাহায্য করবে।কেন আপনার শিশুটির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে এবং তার সেই চাপ কমাবার জন্য সে এবং আপনার পরিবার কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন সে ব্যাপারে আপনার শিশুর সাথে একটা খোলাখুলি আলোচনা আপনি করতে পারেন।

লক্ষণগুলি

  • মাথা এবং ঘাড়ের পেশীগুলি শক্ত হয়ে যাওয়া
  • হালকা থেকে মাঝারি মানের মাথা ব্যথা যাতে মাথার এক বা উভয় পাশের কোথাওই স্পন্দন হয় না।
  • শারীরিক ক্রিয়াকলাপের সাথে যন্ত্রণাটি আরও বেড়ে যায় না ও খারাপ হয় না।
  • এই ধরণের মাথা ব্যথার সাথে বমি বমি ভাব এবং বমি করা সংযুক্ত নয়।

3. ক্লাস্টার বা এক জায়গায় পুঞ্জীভূত মাথা ব্যথা

এই ধরণের মাথা ব্যথা সাধারণত 10 বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা যায়।এই ধরণের মাথা ব্যথা সাধারণত চোখের পিছনে মাথা ব্যথার একটি সারি হিসেবে শুরু হয় এবং সেটি মোটামুটি প্রায় এক সপ্তাহ থেকে এক মাস পর্যন্ত চলতে থাকে।

লক্ষণগুলি

  • এই ধরণের মাথা ব্যথা সাধারণত কমপক্ষে পাঁচটি পর্বের সাথে ঘটে।
  • এই প্রকার মাথা ব্যথাটি প্রতিটি বিকল্প দিনে একবার থেকে একদিনে প্রায় আট বার পর্যন্ত হতে পারে।
  • একটা চোখের পিছনে বা পাশে প্রায় তিন ঘন্টার কম সময় ধরে তীব্র ছুরিকাঘাতের ন্যায় যন্ত্রণা হয়ে থাকে
  • এই ধরণের মাথা ব্যথার সাথে নাক দিয়ে জল পড়া,নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং চোখের পাতা ফুলে যাওয়ার মত বিষয়গুলি জড়িত।

4. দীর্ঘস্থায়ী প্রতিদিনের মাথা ব্যথা

আপনার শিশুর মাথা ব্যথাটি যদি মাইগ্রেন বা টেনশন প্রকৃতির হয়ে থাকে এবং সেটি এক মাসের 15 দিনের বেশি সময় ধরে হতে থাকে তবে সেক্ষেত্রে আপনার শিশুর ডাক্তারবাবু হয়ত এই ধরনের মাথা ব্যথাটিকে দীর্ঘস্থায়ী দৈনিক মাথা ব্যথা বা CDH বলে অভিহিত করে থাকবেন। একাধিক কারণে এই CDH ধরণের মাথা ব্যথাটি হয়ে থাকতে পারে,যার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে কোনও ওষুধের ব্যবহার,সংক্রমণ অথবা সামাণ্য ছোটখাট মাথার আঘাত।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *